এই শহর বাস্তব নয়।
বাস্তবের মতো অভিনয় করে।
এখানকার রাস্তা পাথরের নয়, সময়ের ক্ষয়ে ভেঙে যাওয়া স্মৃতির গুঁড়ো। প্রতিটা পদক্ষেপে ধুলো উড়ে—আর সেই ধুলো যেন মৃত দিনের ছাই, যা এখনও বিলীন হতে পারেনি।
আমি হাঁটছি।
নাকি আমার শরীর হাঁটছে ?
আমি শুধু দেখছি …
কারখানাগুলো দাঁড়িয়ে আছে—
না, দাঁড়িয়ে নেই, টিকে আছে।
লোহার তৈরি সেই দানবগুলো সময়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং সময়ের দাস হয়ে বেঁচে আছে।
খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোহার সেই বিশাল দেহগুলোতে জংয়ের ক্ষত, যেন সময় নিজেই তাদের গায়ে দাগ কেটে রেখে গেছে। কোথাও ধীরে ধীরে পাখা ঘুরছে—অসহায়, ক্লান্ত, যেন সময়ের বিপরীতে সাঁতার কাটার ব্যর্থ চেষ্টা।
একটা কারখানার গভীর পেট থেকে বেরিয়ে আসছে গোলাপি, নীল, বিষাক্ত সবুজ এক তরল মণ্ড—পাথর গলে যেন রঙ হয়ে যাচ্ছে। আরেকটায় একটা প্রকাণ্ড ঘানি ঘুরছে, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শিকলগুলো ঝনঝন করে ওঠে—ঠিক যেন কোনো মৃত প্রাণীর কঙ্কাল এখনও নড়াচড়া করছে।
আর তারপর—সবচেয়ে ভয়ংকরটি।
অক্টোপাসের মতো এক লোহার দানব।
তার লম্বা পাকানো বাহুগুলো চারদিক থেকে রঙিন পাথর কুড়িয়ে নিচ্ছে, নিজের ভেতরে গিলে ফেলছে, আর উগরে দিচ্ছে এক অবিরাম তরল নদী।
আমি থেমে যাই।
দেখি।
অদ্ভুতভাবে ভয় পাই না …..
বরং একরকম কৌতূহল জন্মায়।
মনে হয়—এরা কি চিরকাল এইভাবেই দাঁড়িয়ে আছে?
তারপর চোখ পড়ে রেললাইনের দিকে।
এখানে সময় নিজের নিয়ম মানে না।
কিছু লাইন মাটির গভীরে ডুবে গেছে, কিছু উঠে গেছে আকাশের দিকে—যেন বাস্তব আর অবাস্তবের মাঝখানে ঝুলে আছে।
একটা ট্রেন উপর থেকে নেমে এল, নিঃশব্দে মাটির সমান্তরালে চলতে লাগল।
আরেকটা মাটির নিচে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
কোথা থেকে আসে? কোথায় যায়?
কেউ জানে না।
তবুও সবাই অপেক্ষা করে।
আমার ফেরার খুব তাড়া।
কেন, তা জানি না—কিন্তু বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য কাঁটা বিঁধে আছে। মনে হয়, যদি না ফিরি, তবে কিছু একটা চিরতরে হারিয়ে যাবে।
আমি ছুটতে শুরু করি স্টেশনের দিকে।
আমি এই শহরের প্রেসিডেন্ট।
কিন্তু এখানে কেউ তা জানে না।
আমার ক্ষমতা যেন ধুলোর ওপর লেখা নাম
—এক ঝটকায় মুছে যায়।
মানুষ আমাকে চেনে না, কেউ দরজা খুলে দেয় না। আমাকেও দাঁড়াতে হয় টিকিট কাউন্টারের দীর্ঘ লাইনে।
কাউন্টারটা যেন এক গ্রাম্য কুঁড়েঘর—কাঠের ছাদ, জানালায় লোহার গ্রিল। সামনে অন্তত পঞ্চাশজন মানুষ। তাদের মুখ ধুলোয় মাখা, চোখে ক্লান্তির ছায়া।
আমি হিসাব করি—আমার ট্রেন আসতে আর মাত্র পনেরো মিনিট।
এই লাইনে দাঁড়ালে আমি পারব না।
হঠাৎ এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিই—
টিকিট কাটব না।
আমি এগিয়ে যাই।
একটা মালগাড়ি গর্জন তুলে পাশ কাটিয়ে যায়। তার ফাঁক দিয়ে আমি রেললাইন পার হয়ে পৌঁছে যাই অন্য প্ল্যাটফর্মে।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন এক মহিলা চেকার।
তিনি টিকিট দেখে মানুষ ঢুকতে দিচ্ছেন।
আমার পাশে এসে দাঁড়ায় এক বৃদ্ধা, আর এক ত্রিশোর্ধ্ব পুরুষ।
তাদের দিকে তাকাতেই মনে হয়—
এঁরা আমার কেউ।
আত্মীয়?
না—তার চেয়েও বেশি।
বৃদ্ধার চোখে এক গভীর মমতা, পুরুষটির মুখে এক শান্ত, অনাসক্ত প্রশান্তি।
তারা আমার সঙ্গে হাঁটছে, কিন্তু কোনো কথা বলছে না।
আমার ভয় করছে।
টিকিট নেই।
মহিলা চেকারের সামনে দাঁড়াতেই গলা শুকিয়ে আসে।
তিনি আমার দিকে তাকান—মাত্র এক মুহূর্ত।
কিন্তু সেই এক মুহূর্তেই যেন সব পড়ে ফেলেন—
আমার বুকের ভেতরের কাঁপন, হাতের শূন্যতা, অদৃশ্য তাড়না।
তিনি কিছু বলেন না।
শুধু চোখের ইশারায় বলেন—
“চলে যান।”
আমি ভেতরে ঢুকে পড়ি।
এবার নামতে হবে সাবওয়েতে।
কিন্তু এখানে সিঁড়ি নেই।
ঢালু, পিচ্ছিল পথ—এক পা দিলেই শরীর নিজে থেকেই নিচে নেমে যায়। তবুও পড়ে যাওয়ার ভয় নেই। মনে হয়, মাটি নিজেই আমাকে বহন করছে।
নিচে নেমে আবার সিঁড়ি।
সবাই উঠছে।
আমিও উঠছি।
কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করি—
বৃদ্ধা আর সেই পুরুষটি নেই।
কোথায় গেলেন তারা?
বুকের ভেতর হঠাৎ এক শূন্যতা জন্মায়।
একটা পরিচিত, পুরনো ব্যথা।
ছোটবেলায় একবার মেলায় মায়ের হাত ছেড়ে গিয়েছিলাম। চারপাশে শুধু অচেনা মুখ, আর ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে অসহায় কান্না।
তারপর হঠাৎ—মায়ের হাত।
আজও ঠিক সেই অনুভূতি।
হঠাৎ মায়ের আঁচল হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি
কিন্তু এখানে—
মা নেই।
শুধু আমি, এই অচেনা প্ল্যাটফর্ম, আর সদ্য চলে যাওয়া ট্রেনের একরাশ গন্ধ।
দূরে, কুয়াশার আড়ালে, আমি তাদের দেখতে পাই—
সেই দুই মুখ।
আমি এগোতে চাই।
কিন্তু পা নড়ে না।
ততক্ষণে প্ল্যাটফর্ম ভরে গেছে মানুষের ভিড়ে।
সবাই অপেক্ষা করছে।
আমিও দাঁড়িয়ে থাকি।
ভাবি—তারা ফিরে আসবে।
কিন্তু না।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়।
আমি আমার বিছানায়।
জানালা দিয়ে ভোরের আলো ঢুকছে।
তবুও গলা শুকনো, পা ক্লান্ত—যেন সত্যিই দৌড়ে এসেছি এতদূর।
স্বপ্নের সেই শহর কোথায় গেল?
ইট-বালির রাস্তা, রঙিন মণ্ড উগরে দেওয়া দানবমেশিন, অসমাপ্ত রেললাইন—সব কি মুছে গেল?
আর সেই মানুষ দুজন—
যারা আমার আপন, অথচ অচেনা?
আমি চোখ বুজে শুয়ে থাকি।
হয়তো কোনো সময়স্তরে সেই শহর এখনও আছে।
হয়তো কোনো অদেখা স্টেশনে সেই ট্রেন এখনও দাঁড়িয়ে আছে।
আর সেই বৃদ্ধা আর পুরুষ—
তারা হয়তো এখনও অপেক্ষা করছে।
আমার জন্য।
ধুলোর কাঁটাটা এখনও চোখে।
মুছে ফেললাম। কিন্তু মনে হচ্ছে, মোছা যাচ্ছে না। হয়তো এটা সেই শহরের চিহ্ন—যে আমাকে ডেকে যায়। আবার। কোনো এক অচিনপুরের রেলগাড়িতে।