ওরা মানুষ… কিন্তু আবার মানুষ নয়।
ওদের চোখে প্রাণ নেই, তবুও তারা সব অনুভব করছে—আমাদের উপস্থিতিও।
আর তখনই বুঝলাম—আমরা শুধু রহস্যের কাছে আসিনি… আমরা নিজেরাই এখন সেই রহস্যের অংশ।
সকালের আলো পুরোপুরি ফুটে ওঠার আগেই আমরা রওনা দিয়েছিলাম।
আকাশে তখনো হালকা কুয়াশা ঝুলে আছে, আর মাটির ওপর জমে থাকা শিশিরে পা পড়লেই একটা ঠান্ডা শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছিল।
গতকালের সেই জায়গাটা যেন আমাদের ডাকছিল—অদৃশ্য কোনো শক্তির টানে আমরা আবারও ফিরে যাচ্ছিলাম সেই রহস্যের দিকে।
যখন আমরা সেই ফাঁকা, ঢেউ খেলানো জমিটায় পৌঁছালাম, তখন চারপাশটা অস্বাভাবিকভাবে নিস্তব্ধ।
বাতাস আছে, কিন্তু শব্দ নেই।
পাখির ডাক নেই, পাতার মর্মর নেই—শুধু এক ধরনের চাপা শূন্যতা, যা বুকের ভেতর ভারি হয়ে বসে থাকে।
আমরা ধীরে ধীরে এগোতে লাগলাম।
হঠাৎ আমার চোখ পড়ল—দূরে কয়েকটা অবয়ব নড়ছে।
আমি হাত তুলে সবাইকে থামতে বললাম।
“ওদিকে দেখ…”
সবাই তাকালো।
দূরে, হালকা কুয়াশার ভেতর, কয়েকজন মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কিন্তু তারা সাধারণ মানুষ নয়—প্রথম দেখাতেই বোঝা যাচ্ছিল।
তাদের গঠন অস্বাভাবিকভাবে লিকলিকে, ছোটখাটো, যেন শরীরের মাংসপেশি ঠিকমতো গড়ে ওঠেনি।
হাত-পা সরু, হাঁটার ভঙ্গি অদ্ভুত, প্রায় যান্ত্রিক।
তাদের সবচেয়ে অদ্ভুত দিক ছিল মাথা।
প্রত্যেকের মাথায় শক্ত করে বাঁধা এক ধরনের কাপড়—দেখতে সাধারণ নেকড়ার মতো, কিন্তু সেটা এমনভাবে জড়ানো যে মাথার প্রায় পুরো অংশ ঢেকে রেখেছে।
সেই কাপড়ের নিচে যেন কিছু একটা স্পন্দিত হচ্ছে… যেন ওটা শুধু কাপড় নয়, বরং কোনো যন্ত্র।
আর তাদের কান…
স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় একটু বড়, লম্বাটে, সামান্য বাইরের দিকে বেরোনো।
আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
“এরা… মানুষ না।”
আমার এক সঙ্গী ফিসফিস করে বলল, “তাহলে?”
আমি চোখ না সরিয়েই বললাম,
“হাউজা জাতি…”
শব্দটা আমার নিজের কাছেই অচেনা লাগছিল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে ঠিক মনে হচ্ছিল।
আমরা লক্ষ্য করলাম—তারা যেন কিছু খুঁজছে, আবার যেন কিছু পাহারা দিচ্ছে।
তাদের চলাফেরা এলোমেলো, কিন্তু তবুও একটা অদৃশ্য নিয়ম মেনে চলছে।
কেউ কারো সাথে কথা বলছে না, তবুও তারা যেন একে অপরকে বুঝতে পারছে।
হঠাৎ পাশের একজন খুব নিচু স্বরে বলল,
“দেখেছ? ওদের চোখ…”
আমি ভালো করে তাকালাম।
ওদের চোখে এক ধরনের শূন্যতা।
কোনো অনুভূতি নেই, কোনো প্রশ্ন নেই—শুধু স্থির, নিষ্প্রাণ দৃষ্টি।
যেন তারা নিজেরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেই।
তখনই আমার মাথায় একটা ভাবনা এলো।
ওদের মাথায় বাঁধা ওই কাপড়…
ওটাই আসল রহস্য।
আমি ধীরে ধীরে বললাম,
“ওই কাপড়টা… ওটা শুধু কাপড় না। ওটা ওদের কন্ট্রোল করছে।”
আমার কথা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল।
“ওদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে… যাতে তারা সব ধরনের ফ্রিকোয়েন্সি অনুভব করতে পারে।”
“শুধু শোনা নয়—অনুভব করা, বুঝতে পারা, এমনকি দূর থেকে যোগাযোগ করা।”
একজন অবাক হয়ে বলল,
“মানে… ওরা একে অপরের সাথে কথা না বলেও যোগাযোগ করতে পারে?”
আমি মাথা নাড়লাম।
“হ্যাঁ… সম্ভবত।”
কিন্তু তখনই একটা জিনিস আমাদের চোখে পড়ল।
হঠাৎ দূরে কোথাও একটা তীক্ষ্ণ শব্দ হলো—হয়তো কোনো ধাতব কিছু পড়ে গিয়েছিল।
আর সঙ্গে সঙ্গে ওদের আচরণ বদলে গেল।
তারা সবাই থমকে দাঁড়ালো।
তারপর একসাথে মাথা চেপে ধরল।
কারো কারো শরীর কাঁপতে লাগল, কেউ মাটিতে বসে পড়ল।
তাদের মুখ বিকৃত হয়ে গেল—যেন অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে।
“ওরা… সহ্য করতে পারছে না…”
আমি ফিসফিস করে বললাম।
“উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ… ওদের জন্য বিষের মতো।”
আমরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে সেই দৃশ্য দেখছিলাম।
কয়েক সেকেন্ড পর শব্দটা থেমে যেতেই তারা ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল।
যেন কিছুই ঘটেনি।
আবার আগের মতোই হাঁটতে শুরু করল।
আমার শরীর কেঁপে উঠল।
এটা কোনো সাধারণ জাতি নয়।
এরা তৈরি করা হয়েছে… বদলে দেওয়া হয়েছে…
হঠাৎ আমার চোখ পড়ল তাদের মধ্যে একজনের ওপর।
সে অন্যদের মতো নয়।
সে লম্বা… অস্বাভাবিকভাবে লম্বা।
আর সে নড়ছে না।
স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তার মুখ আকাশের দিকে তোলা… যেন সে কিছু অনুভব করছে, কিছু শুনছে… যা আমরা শুনতে পাচ্ছি না।
আমার বুকের ভেতর একটা চাপা অস্বস্তি তৈরি হলো।
লোকটা ধীরে ধীরে আমাদের দিকেই মাথা ঘোরাল।
আমাদের চোখের সাথে তার চোখ মেলামাত্র আমার মনে হলো—
সে জানে আমরা এখানে আছি।
আর সেই মুহূর্তে আমি বুঝে গেলাম—
আমরা শুধু তাদের দেখছি না…
তারা আমাদেরও অনুভব করছে।
আমার চোখ তখন সেই লম্বা লোকটার ওপর।
সে অন্যদের মতো নয়।
সে অদৃশ্য হচ্ছে না।
সে দাঁড়িয়ে আছে… আকাশের দিকে তাকিয়ে।
যেন সে কিছু ভাবছে… বা অপেক্ষা করছে।
আমি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেলাম।
“এই যে… শুনছেন?”
সে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল।
তার চোখে ভয়।
হ্যাঁ—ভয়।
“এখান থেকে চলে যান…”
তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
“এখানে কিছু নেই… আর যা আছে… সেটা আপনারা বুঝতে পারবেন না।”
আমি এগিয়ে গেলাম।
“আপনি কে?”
সে হঠাৎ কঠিন হয়ে গেল।
“যাও!”
তারপর ঘুরে হাঁটতে শুরু করল।
আমরা তাকে অনুসরণ করলাম।